মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র “বীরাঙ্গনা কাব্য” বাংলা ভাষার একমাত্র পত্রকাব্য। মাইকেলের বিশেষ কাব্যরীতি মেনেই এই কাব্যও অমিত্রাক্ষর ছন্দে ছন্দায়িত। “পত্রকাব্য” শব্দের ব্যুৎপত্তি ধরেই বলা যায়, এটা এমন কবিতা যা চিঠির মাধ্যমে লেখা। এবার চিঠি মানেই তার প্রেরক, প্রাপক এবং প্রেরণা থাকবে, আর এই পত্রকাব্যও ঐতিহাসিক, গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈপ্লবিক হয়ে উঠেছে এই তিন কারণেই। সর্বমোট এগারোটা চিঠি, এগারো জন বীরাঙ্গনার লেখা। এবার বীরাঙ্গনা কী আর কারা?? প্রথম প্রশ্ন “কারা”, এই এগারো জন : শকুন্তলা, তারা, রুক্মিণী, কেকয়ী [ কৈকেয়ী ], শূর্পণখা, দ্রৌপদী, ভানুমতী, দুঃশলা, জাহ্নবী, ঊর্বশী, এবং জনা। এবার বীরাঙ্গনা “কী” : এই শব্দ নিয়ে দ্বন্দ্বের অন্ত নেই, তবে কেবল শব্দটা শুনে বীরাঙ্গনা মানে “বীর নারী” তা ভেবে নিলে মাইকেলকে অস্বীকার করা হবে। এই কাব্যে কেউই প্রায় বীর অর্থে যা বোঝায় তার সাক্ষ বহন করেন না। এই বীরাঙ্গনা শব্দের অর্থ : বীর + অঙ্গনা। বীর শব্দ “শ্রেষ্ঠ” অর্থ বহন করে। কিন্তু এতেই সবটুকু নয়। অঙ্গনা শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে আরও উল্লেখযোগ্য পরিচয় লাভ করতে পারব। কারণ অঙ্গনার অর্থ শুধুমাত্র নারী, ললনা, কামিনীর বা রমণী নয়। অঙ্গনা শব্দের বিভাজনে পাওয়া যায় – অঙ্গন (প্রশংসার্থে) + আ (স্ত্রীলিঙ্গে)— অঙ্গ সুন্দর যে নারীর। অতএব বীরাঙ্গনা শব্দটির অর্থ হল “শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী”। এই শ্রেষ্ঠত্ব বীর্যের বিচারে। সুতরাং বীরাঙ্গনা শব্দটির মধ্যেই বীর্য ও সৌন্দর্যের মিলিত পরিচয় নিহিত আছে। মধুসূদনের ভাষায় “Most noted Puranic women”। রেনেসাঁসের চেতনায় প্রত্যয়বান মধুসূদন সৌন্দর্য মাধুর্যের সঙ্গে বীর্যের সম্মিলন ঘটিয়েই নারীকে মহিমান্বিত করে তুলেছেন।
এই থিয়েটারের ক্ষেত্রে পাঁচটি পত্র বেছে নেওয়া হয়েছে :
১ ] সোমদেবের প্রতি তারা
২ ] দশরথের প্রতি কেকয়ী
৩ ] লক্ষ্মণের প্রতি শূর্পণখা
৪ ] জয়দ্রথের প্রতি দুঃশলা
৫ ] নিলধ্বজের প্রতি জনা
এই পাঁচ পৌরাণিক নায়িকার বিদ্রোহের ইশতেহার এই পত্র। মধু কবির কলমে পুরাণ ছোঁয়া পেয়েছে নবজাগরণের, তাই এই পুরাণ নায়িকারা হয়ে উঠেছেন বীরাঙ্গনা। “তারা”-র নিন্দিত প্রেমের নন্দিত স্বীকারোক্তি, “কেকয়ী”-র প্রতিশ্রুতির ভঙ্গে প্রলয় পত্রাঘাত, “শূর্পণখা”-র বীভৎসতার বিরুদ্ধে প্রণয় বিহান, “দুঃশলা”-র নিয়তির নরকেও প্রিয়তমা নারীর নৈবেদ্য, আর “জনা”-র সন্তানহারা জননীর সন্ত্রস্ত ও সন্ত্রাসী কান্না ; যুগ বদলের সাক্ষী, বিদ্রোহের অনুঘটক। এরা কেবল নারী নন, এনারাই নবজাগরণ। দেশ, কাল, সময়কে ছিন্ন করে এই বিদ্রোহিনীরাই ইতিহাস লিখছেন জীবন দিয়ে। প্রতিটা পত্রই নারীর বীরাঙ্গনা হয়ে বাঁচা এবং তিরস্কার ও পুরস্কার মুড়ে বাকিদের বাঁচানোর লড়াই।
“বীরাঙ্গনা কাব্য” অসম্ভব উত্থান পতনে নাট্যমূহুর্তে বাঁধা এবং অভিনয় সম্ভাবনাময় মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র কালজয়ী এক অমোঘ সৃষ্টি আর এই সৃষ্টির নির্মাণই হলো আমাদের এই থিয়েটার।